26.8 C
Dhaka
Wednesday, June 10, 2026

ত্রয়োদশ সংসদের শপথে নতুন বিতর্ক: সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে অনিশ্চয়তা, বিএনপির ‘না’—জামায়াত-এনসিপির ‘হ্যাঁ’

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নবনির্বাচিত সদস্যরা শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা। বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্যরা এমপি হিসেবে শপথ নিলেও প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে। অন্যদিকে জামায়াত ও এনসিপির ৭৭ জন নির্বাচিত সদস্য একই সঙ্গে সংসদ সদস্য ও পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন।

জুলাই আদেশ ও গণভোটের প্রেক্ষাপট

রাষ্ট্রপতির জারি করা জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুযায়ী, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবেন। ৬০ সদস্যের উপস্থিতিতে (কোরাম) পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে বলে আদেশে উল্লেখ রয়েছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়লাভ করায় আদেশ বাস্তবায়নের পথ উন্মুক্ত হয়েছে।

তবে বিএনপি এই পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।

বিএনপির অবস্থান

সংসদ ভবনে শপথ গ্রহণের আগে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধানে এখনো সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথের বিধান অন্তর্ভুক্ত হয়নি। গণভোটের রায় অনুযায়ী পরিষদ গঠিত হলেও সেটি সংবিধানে প্রতিফলিত করতে হবে এবং শপথ গ্রহণের বিধান সাংবিধানিকভাবে যুক্ত করতে হবে।

বিএনপির দাবি, তারা সংবিধান মেনেই চলবে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার সংসদের মাধ্যমে সাংবিধানিক পদ্ধতিতেই সম্পন্ন করবে।

জামায়াত-এনসিপির প্রতিক্রিয়া

বিএনপির শপথ না নেওয়ায় প্রথমে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায় এনসিপি। দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া অভিযোগ করেন, “গণভোটের জনরায়ের সাথে প্রতারণা করে শপথ নিতে যাচ্ছে সরকার।” পরে এনসিপি মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান বয়কটের ঘোষণা দেয়।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, নির্বাচন কমিশন থেকে দুটি শপথের জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছিল। বিএনপি একটি শপথ নিয়ে সংসদে গেলে তার কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

পরবর্তীতে জামায়াত ও এনসিপির সদস্যরা সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য—উভয় হিসেবেই শপথ নেন।

শুধু ৭৭ জন নিয়েই কি পরিষদ চলবে?

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, আদেশ অনুযায়ী ৬০ সদস্য উপস্থিত থাকলেই পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব। সে হিসেবে ৭৭ জন সদস্য চাইলে পরিষদ আহ্বান করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, এমনকি নতুন সংবিধান প্রণয়নও করতে পারেন।

তবে সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক মনে করেন, গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে যদি জুলাই আদেশ বাস্তবায়নযোগ্য হয়ে থাকে, তাহলে আলাদা করে সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রয়োজনীয়তা নিয়েই প্রশ্ন উঠতে পারে। তার মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এখন জনগণের প্রধান চাওয়া, তাই সংঘাতমুখী কোনো পদক্ষেপ জনসমর্থন পাবে না।

আইনি প্রশ্ন ও রিট আবেদন

এদিকে গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের হয়েছে। সংবিধানে গণভোটের বিধান না থাকায় রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারি করে গণভোট আয়োজনের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আইনজ্ঞরা।

মনজিল মোরসেদ বলেন, রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ সংবিধানের সীমার বাইরে যেতে পারে না। গণভোট ও জুলাই আদেশকে বৈধতা দিতে হলে সংসদে তা উত্থাপন করে অনুমোদন প্রয়োজন হতে পারে। বিএনপি সংসদে এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়, তা এখন দেখার বিষয়।

সামনে কী?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি চাইলে সংসদে বিল উত্থাপনের মাধ্যমে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় সংবিধান সংশোধন করতে পারে—যা হবে স্থিতিশীলতার পথে এগোনোর উপায়। অন্যদিকে, জুলাই আদেশ ঘিরে ভিন্ন ব্যাখ্যা ও রাজনৈতিক অবস্থান দেশের রাজনীতিতে নতুন অস্থিরতার আশঙ্কাও তৈরি করছে।

এখন নজর সংসদের পরবর্তী অধিবেশন ও আদালতের সিদ্ধান্তের দিকে—সংবিধান সংস্কার পরিষদ আদৌ কার্যকর হবে, নাকি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় নতুন সমাধান আসবে, সেটিই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের রাজনৈতিক গতিপথ।

Related Articles

Stay Connected

5,000FansLike
4,000FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

Latest Articles