চট্টগ্রাম বন্দরের দুটি গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালের দায়িত্ব বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দিয়ে আজ পৃথক দুটি চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে ডেনমার্কভিত্তিক এপিএম টার্মিনালস, আর ঢাকার কেরানীগঞ্জের পানগাঁও নৌ টার্মিনাল পরিচালনা করবে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক মেডলগ এসএ।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান দুটি অনুষ্ঠিত হয় ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে। তবে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্তাবলি প্রকাশ করা হয়নি। নৌপরিবহন উপদেষ্টা জানিয়েছেন, ধাপে ধাপে শর্তগুলো জানানো হবে। এদিকে চুক্তি নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও শ্রমিক সংগঠন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
লালদিয়া টার্মিনাল: ৬,৭০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ
সরকারি–বেসরকারি অংশীদারত্বে (PPP) লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও ৩০ বছরের জন্য পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে এপিএম টার্মিনালস, যা মায়ের্সক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান।
- বিনিয়োগ: ৫৫ কোটি ডলার (প্রায় ৬,৭০০ কোটি টাকা)
- সাইনিং মানি: ২৫০ কোটি টাকা
- ক্ষমতা: বছরে ৮–১০ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডলিং
- সরকারের আয়:
- প্রতি কনটেইনারে ২১ ডলার (৮ লাখ পর্যন্ত)
- ৮ লাখের বেশি হলে প্রতি কনটেইনারে ২৩ ডলার
চুক্তিতে সই করেন এপিএম টার্মিনালসের ভাইস প্রেসিডেন্ট মার্টেইন ভ্যান ডোঙ্গেন এবং বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান। অনুষ্ঠানে ডেনমার্ক ও বাংলাদেশ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এপিএম গ্রুপের চেয়ারম্যান রবার্ট মেয়ার্স্ক উগলা বলেন, “লালদিয়া হবে একটি আধুনিক গ্রিনফিল্ড টার্মিনাল। নিরাপত্তা, অটোমেশন ও স্থায়িত্ব—সবক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করা হবে।”
পানগাঁও নৌ টার্মিনাল: ৪৯০ কোটি টাকার বিনিয়োগ
২২ বছরের জন্য পানগাঁও নৌ টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে সুইজারল্যান্ডের প্রতিষ্ঠান মেডলগ এসএ।
- বিনিয়োগ: ৪ কোটি ডলার (৪৯০ কোটি টাকা)
- সাইনিং মানি: ১৮ কোটি টাকা
- ক্ষমতা: বছরে ১ লাখ ৬০ হাজার কনটেইনার
- সরকারের আয়: প্রতি কনটেইনারে ২৫০ টাকা
চুক্তিতে সই করেন বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান এবং মেডলগ বাংলাদেশের এমডি এ টি এম আনিসুল মিল্লাত।
সরকারের বক্তব্য: “জাতির জন্য বড় অবদান”
নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন,
“এই চুক্তি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে জাতির জন্য বড় অবদান। যাঁদের সন্দেহ ছিল, আশা করি তা দূর হবে।”
পিপিপি কর্তৃপক্ষের সিইও আশিক চৌধুরী জানান, ভবিষ্যতে আরও চারটি নতুন বন্দর নির্মাণের কাজ শেষ হবে।
ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন ভার্চুয়াল বার্তায় বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এখন সহায়তা থেকে ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।
উদ্বেগ প্রকাশ করছে বিভিন্ন সংগঠন
চুক্তির সমালোচনা করে পৃথক বিবৃতি দিয়েছে—
- চট্টগ্রাম শ্রমিক–কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)
- বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
- হেফাজতে ইসলাম
তাঁরা বলেন, গুরুত্বপূর্ণ বন্দর অবকাঠামো বিদেশি কোম্পানির হাতে দেওয়ায় জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এর জবাবে নৌপরিবহন উপদেষ্টা বলেন,
“যাঁরা বুঝতে পারছেন না, তাঁরা বিষয়টি ভালোভাবে বুঝুন। বিরোধিতা করতে অসুবিধা নেই, কিন্তু দেশের ভবিষ্যৎও ভাবতে হবে।



