রাশিয়ার বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে এসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা ঘিরে কিয়েভ গুরুতর কূটনৈতিক চাপে পড়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সতর্ক করে বলেছেন—এই পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।
শুক্রবার জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, ইউক্রেনকে এখন “একটি কঠিন সিদ্ধান্তের সামনে” দাঁড়াতে হতে পারে—“আত্মমর্যাদা ধরে রাখবে, নাকি গুরুত্বপূর্ণ মিত্রকে হারানোর ঝুঁকি নেবে।” তাঁর ভাষায়, এটি ইউক্রেনের জন্য যুদ্ধকালীন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
ফাঁস হওয়া মার্কিন পরিকল্পনায় রুশপন্থী শর্ত
যুক্তরাষ্ট্রের ২৮ দফার শান্তি পরিকল্পনার বেশ কিছু প্রস্তাব আগেই কিয়েভ প্রত্যাখ্যান করেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- পূর্বাঞ্চলের কিছু অংশের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়া
- সেনাবাহিনীর আকার কমিয়ে আনা
- ন্যাটোয় যোগ না দেওয়ার অঙ্গীকার
বিশ্লেষকদের মতে এসব প্রস্তাব রাশিয়ার স্বার্থকেই বেশি এগিয়ে রাখছে। মস্কোও ইঙ্গিত দিয়েছে, এই পরিকল্পনা শান্তির ভিত্তি হতে পারে। পুতিন জানিয়েছেন, বিস্তারিত এখনো আলোচনা হয়নি, তবে রাশিয়া “নমনীয়তা দেখাতে প্রস্তুত”, একই সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্যও প্রস্তুত।
ট্রাম্পের চাপ স্পষ্ট
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, জেলেনস্কিকে এই পরিকল্পনা মেনে নিতেই হবে, নাহলে যুদ্ধ চলতে থাকবে। তিনি কিয়েভকে ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত সময় দিয়েছেন, প্রয়োজনে সময়সীমা বাড়ানো যেতে পারে বলেও জানিয়েছেন।
উইয়াশিংটনে আকাশ প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সহায়তার জন্য কিয়েভের মার্কিন নির্ভরতা অত্যন্ত বেশি—তাই এই বার্তা ইউক্রেনের জন্য আরও চাপ সৃষ্টি করেছে।
পশ্চিমা মিত্রদের বার্তা
জেলেনস্কি বলেছেন, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ এবং জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেৎস তাঁকে অব্যাহত সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছেন।
স্যার কিয়ের জানিয়েছেন, ইউক্রেনের সহযোগীরা “ন্যায়সঙ্গত ও টেকসই” শান্তির পক্ষে।
জি-২০ সম্মেলনে ট্রাম্প অনুপস্থিত থাকলেও পশ্চিমা নেতারা তাঁর প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করবেন বলে জানানো হয়েছে।
রাশিয়ার অগ্রগতি ও কিয়েভের অভ্যন্তরীণ সংকট
দক্ষিণ-পূর্ব ইউক্রেনের কিছু এলাকায় রাশিয়ার ধীর অগ্রগতির খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে কিয়েভে উচ্চপর্যায়ের ১০০ মিলিয়ন ডলারের দুর্নীতি অভিযোগ নিয়ে জেলেনস্কি নিজেও অভ্যন্তরীণ চাপে আছেন।
ফাঁস হওয়া পরিকল্পনার বিতর্কিত দিক
মার্কিন পরিকল্পনার খসড়ায় বলা হয়েছে—
- লুহানস্ক ও দোনেৎস্কের কিছু এলাকা থেকে ইউক্রেন সেনা প্রত্যাহার
- ক্রাইমিয়ার দক্ষিণাঞ্চল থেকেও সরে আসা
- খারসন–ঝাপোরিজ্জিয়া সীমান্ত বন্ধ করা
- ইউক্রেনের সেনাবাহিনীকে ৬ লাখে নামিয়ে আনা
- পশ্চিমা যুদ্ধবিমান পোল্যান্ডে রাখা
- রাশিয়াকে জি–৭ এ যুক্ত করে জি–৮ করা
এই পরিকল্পনার খবরেই ইউক্রেনজুড়ে নেগেটিভ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। নিহত এক সেনার স্ত্রী বিবিসিকে বলেন, “এটা কোনো শান্তি পরিকল্পনা নয়, এটা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা।”
এতসব চাপের মধ্যেই জেলেনস্কির চূড়ান্ত সতর্কতা
প্রেসিডেন্সিয়াল অফিসের সামনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন,
“আমাদের দুর্বল করতে, বিভক্ত করতে অনেক চাপ আসবে। শত্রুরা ঘুমিয়ে নেই।”
তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, ইউক্রেন ও তার মিত্ররা “শান্তিপূর্ণ কিন্তু সম্মানজনক” সমাধানের পথ খুঁজে নেবে।



