26.8 C
Dhaka
Wednesday, June 10, 2026

নরিয়েগার পর মাদুরো: ৩৭ বছর পর লাতিন আমেরিকায় সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্র

১৯৮৯ সালে পানামার শাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে গ্রেপ্তারের পর দীর্ঘ সময় লাতিন আমেরিকার কোনো দেশে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করেনি যুক্তরাষ্ট্র। তবে ২০২৬ সালের শুরুতেই সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটালেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

গত শুক্রবার গভীর রাতে ভেনেজুয়েলার একাধিক সামরিক স্থাপনায় আকস্মিক হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে মার্কিন বিশেষ বাহিনী। রাজধানী কারাকাস থেকে ক্ষমতাসীন এক প্রেসিডেন্টকে রাতের অন্ধকারে তুলে নিয়ে যাওয়ার এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা যুক্তরাষ্ট্রের লাগামহীন ক্ষমতার এক নজিরবিহীন প্রদর্শন হিসেবে দেখছেন।

ট্রাম্পের ঘোষণায় বিশ্ব চমকে

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাত্র ৭৪ শব্দের একটি পোস্টে এই অভিযানের কথা জানান। তিনি ঘোষণা দেন, মাদুরোকে একটি মার্কিন নৌজাহাজে করে নিউইয়র্কে নেওয়া হয়েছে, যেখানে তাকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। আন্তর্জাতিক আইন কিংবা এই অভিযানের বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে কোনো ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেননি ট্রাম্প।

নরিয়েগা ও সাদ্দামের স্মৃতি ফিরিয়ে আনা অভিযান

এই ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয় ১৯৮৯ সালে পানামার সামরিক শাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে গ্রেপ্তারের ঘটনাকে। নরিয়েগা ও মাদুরো—উভয়ের বিরুদ্ধেই বিতর্কিত নির্বাচন ও মাদক পাচারের অভিযোগ ছিল। তবে নরিয়েগাকে গ্রেপ্তারের আগে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধে জড়াতে হয়েছিল এবং তিনি ভ্যাটিকান দূতাবাসে আশ্রয় নিয়ে পরে আত্মসমর্পণ করেন।

অন্যদিকে, মাদুরোর পরিণতির সঙ্গে অনেক বিশ্লেষক তুলনা করছেন ২০০৩ সালে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের গ্রেপ্তারের ঘটনার। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—নরিয়েগা ও সাদ্দাম, দুজনই একসময় ওয়াশিংটনের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন। ঠিক তেমনই, ভেনেজুয়েলার তেলনীতিও একসময় যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের অনুকূলে ছিল।

মাদুরোর বিরুদ্ধে অভিযোগ ও ‘মনরো মতবাদ’

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, নিকোলাস মাদুরো অবৈধভাবে ক্ষমতা ধরে রেখেছেন এবং ব্যক্তিগতভাবে মাদক পাচার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে গত কয়েক মাস ধরেই ক্যারিবীয় সাগরে মার্কিন নৌবহর ও পরমাণু-ডুবোজাহাজ মোতায়েন করা হয়েছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, এই অভিযানের পেছনে শুধু অপরাধ দমন নয়—বরং ১৯ শতকের ‘মনরো মতবাদ’ পুনরুজ্জীবনের প্রচেষ্টাও রয়েছে। এই মতবাদ অনুযায়ী পশ্চিম গোলার্ধকে যুক্তরাষ্ট্র তার একক প্রভাববলয় হিসেবে বিবেচনা করে। ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকানো এবং ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।

ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ: শান্তি না বিশৃঙ্খলা?

মাদুরোকে আটকের পর ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি জানিয়েছেন, মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক-সন্ত্রাসবাদ ও অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগ আনা হয়েছে।

তবে আন্তর্জাতিক মহলের একটি বড় অংশ এই বিচারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করছে। কারণ হোয়াইট হাউস দীর্ঘদিন ধরেই ভেনেজুয়েলার বামপন্থি সরকার উৎখাতে আগ্রহী ছিল।

এখন মূল প্রশ্ন—মাদুরোর পতনের পর ভেনেজুয়েলায় কি স্থিতিশীলতা ফিরবে, নাকি দেশটি গৃহযুদ্ধের দিকে এগোবে? বিরোধীদলীয় নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো বা এডমান্ডো গঞ্জালেসের ক্ষমতায় আসার পথ উন্মুক্ত হলেও, সেনাবাহিনীর বড় অংশ এখনো মাদুরোর প্রতি অনুগত থাকতে পারে।

ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এটি একটি বড় রাজনৈতিক ও কৌশলগত বিজয় হলেও, এর ফলে ভেনেজুয়েলা এবং পুরো লাতিন আমেরিকায় যে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে—তা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Related Articles

Stay Connected

5,000FansLike
4,000FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

Latest Articles