সারা দেশে অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে দিনের তাপমাত্রা। রোদের দেখা নেই বললেই চলে। ঘন কুয়াশা আর কনকনে ঠান্ডায় পৌষের শেষভাগে কাঁপছে পুরো দেশ। শীতের তীব্রতায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। কমে গেছে সড়ক, হাটবাজার ও কর্মস্থলে মানুষের উপস্থিতি।
শীতজনিত রোগে সবচেয়ে বেশি ভুগছে শিশু ও বয়স্করা। সর্দি-কাশি, ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টে হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর চাপ। অন্যদিকে ঘন কুয়াশার কারণে বিমান চলাচল, অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ এবং সড়ক ও রেল যোগাযোগও বারবার ব্যাহত হচ্ছে।
কুয়াশায় থমকে যাচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থা
রানওয়ে দৃশ্যমান না থাকায় ঘন কুয়াশার কারণে শুক্রবার রাত থেকে শনিবার ভোর পর্যন্ত হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কোনো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট অবতরণ করতে পারেনি। এতে প্রায় ডজনখানেক ফ্লাইট ২ থেকে ৪ ঘণ্টা বিলম্বে ঢাকায় পৌঁছায়।
শীত বাড়লেও কমছে না কুয়াশা
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, দেশে শীতের সময়কাল কমলেও তীব্রতা বেড়েছে। সাধারণত বৃষ্টিপাত হলে কুয়াশাবলয় কেটে আকাশ পরিষ্কার হয়। কিন্তু বায়ুদূষণের তীব্রতার কারণে কুয়াশা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। আপাতত বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনাও নেই।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক ও আবহাওয়াবিদ মো. মমিনুল ইসলাম জানান, জানুয়ারি মাসে দেশের ওপর দিয়ে ৪ থেকে ৫টি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে ২ থেকে ৩টি মাঝারি এবং অন্তত একটি তীব্র শৈত্যপ্রবাহের আশঙ্কা রয়েছে। কুয়াশাবলয় ও সূর্যের আলো না পৌঁছানোর কারণেই শীত বেশি অনুভূত হচ্ছে। জানুয়ারি জুড়েই এই অবস্থা বিরাজ করতে পারে—মাঝে মাঝে কমবে, আবার বাড়বে।
আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ বলেন, দেশে শীতের ধরনে পরিবর্তন এসেছে। ঘন কুয়াশার প্রবণতা বেড়েছে। ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর ঢাকায় ১৫ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়, যা গত ২০ বছরে নজিরবিহীন। অথচ কয়েক দিন আগেও তাপমাত্রা ছিল ২৮-২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
তিনি আরও বলেন, শৈত্যপ্রবাহ নিজে বড় সমস্যা নয়। আকাশ পরিষ্কার থাকলে এবং সূর্যের আলো পাওয়া গেলে তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলেও শীত কম অনুভূত হয়। আশা করা যায়, ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
৯ জেলায় মৃদু শৈত্যপ্রবাহ
শনিবার রাজশাহী, পাবনা, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া জেলার ওপর দিয়ে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে গেছে, যা অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
কৃষক ও খামারিদের উদ্বেগ
তীব্র শীতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন কৃষক ও খামারিরা। সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার কৃষক মো. সালিম জানান, তীব্র শীতে ইরি ধানের বীজতলা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অনেক চারা সাদা হয়ে মরে গেছে। এতে আসন্ন রোপণ মৌসুমে চারা সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
উত্তরাঞ্চলে তাপমাত্রা ৯–১০ ডিগ্রিতে নেমে
কুড়িগ্রামে শনিবার সকাল ৬টায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সূর্যের দেখা না মেলায় সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত কুয়াশা বৃষ্টির মতো ঝরেছে। পঞ্চগড়ে তেঁতুলিয়ায় তাপমাত্রা নেমেছে ১০ দশমিক ২ ডিগ্রিতে, আর জয়পুরহাট ও নওগাঁ অঞ্চলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
শীতার্তদের সহায়তা
পঞ্চগড় জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ইতোমধ্যে শীতার্তদের মধ্যে ১৬ হাজার ১৪০টি কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে ২৩ লাখ ৬৫ হাজার টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে।
স্বাস্থ্য সতর্কতা
কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সৈয়দা মেহনাজ বলেন, শীতের সময় সবাইকে পর্যাপ্ত গরম পোশাক ব্যবহার করতে হবে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সুষম খাদ্য গ্রহণ জরুরি।



