26.8 C
Dhaka
Wednesday, June 10, 2026

যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা বন্ধ, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শিশুদের প্রাণ সংকট: “আমার মেয়েটা বাঁচানো গেল না”

বাংলাদেশের কক্সবাজারের বিশাল রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের এক কোণে, বাঁশ ও ত্রিপলের তৈরি ছোট্ট একটি ঘরে মাটিতে বসে মা ফাতিমা বেগম তাঁর শিশু কন্যা সোফিয়াকে খাবারের পেস্ট খাওয়াচ্ছেন—শিশু অপুষ্টি প্রতিরোধের জন্য তৈরি বিশেষ খাদ্য ‘রেডি টু ইউজ থেরাপিউটিক ফুড (RUTF)’ দিয়ে মেয়ের জীবন বাঁচানোর লড়াই করছেন তিনি।

এই খাবার এসেছে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সহযোগিতায়, প্যাকেটের গায়ে এখনো স্পষ্ট USAID লেখা। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তে USAID বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর প্রতি বছর ৮ বিলিয়ন ডলার সহায়তা কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক ত্রাণ কার্যক্রমে ভয়াবহ সংকট দেখা দিয়েছে।

এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবির কক্সবাজারে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা বেড়েছে ১১%

“আগে ফল-মাছ দিত, এখন আর দেয় না,” বলেন ফাতিমা বেগম, যিনি ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গণহত্যা থেকে পালিয়ে এসেছিলেন। “তবু যা দেয়, তাই নিয়ে আমরা বাঁচার চেষ্টা করি।”

সোফিয়া এখন দিনে ২.৫ প্যাকেট RUTF পায়—প্রতিটি প্যাকেটে ৫০০ ক্যালোরি। কিন্তু ইউনিসেফ জানিয়েছে, জুলাই থেকে তাদের মজুদ এতটাই কমে গেছে যে প্রতিটি শিশুকে বরাদ্দ প্যাকেট সংখ্যা কমাতে হয়েছে।

জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস কক্সবাজার সফরের পর বলেছেন,

“এখানকার পরিস্থিতি ভয়াবহ। সাহায্য না পেলে মানুষ কষ্ট পাবে, এমনকি মারা যাবে।”

তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, সহায়তা কমানো কোনো মৃত্যুর কারণ নয়—এটি কেবল “আমাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য গৃহীত প্রশাসনিক সংস্কার।”

কিন্তু ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে, এই সহায়তা হ্রাসের কারণে আগামী পাঁচ বছরে বিশ্বজুড়ে কোটি ৪০ লাখ মানুষ মারা যেতে পারে


তহবিলের টানাপোড়েন

কক্সবাজারের ১৫ নম্বর ক্যাম্পে ইউনিসেফ, ডব্লিউএফপি ও কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইড পরিচালিত পুষ্টি কেন্দ্রে এখন প্রতিদিন লম্বা লাইন। শিশুদের বাহু মেপে দেখা হয়—অধিকাংশই অপুষ্টিতে ভুগছে।

ইউনিসেফের শিশু পুষ্টি ও উন্নয়ন প্রধান দীপিকা শর্মা বলেন,

“এখন যেসব শিশু গুরুতর অপুষ্টিতে আক্রান্ত, তারা সরাসরি মৃত্যুঝুঁকিতে।”

অর্থ সংকটে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (UNHCR) তাদের বিশ্বব্যাপী প্রায় ৫,০০০ জন কর্মী ছাঁটাই করেছে। খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও টিকা কর্মসূচি সংকুচিত হচ্ছে দ্রুত।

বাংলাদেশ সরকারের অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ প্রত্যাবাসন কমিশনারের (RRRC) কার্যালয়ের যুগ্মসচিব শামসুদ দৌজা বলেন,

“সহায়তা কমছে, তহবিল কমছে, চাকরি হারাচ্ছে অনেকে। শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবা সংকুচিত হচ্ছে।”

জাতিসংঘ জানিয়েছে, খাদ্য সহায়তার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ না পেলে দুই মাসের মধ্যে পুরো রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের খাদ্য বিতরণ বন্ধ হয়ে যাবে


মৃত্যুর মিছিল

রোহিঙ্গা শরণার্থী মরিয়ম খাতুনের ৭ বছরের মেয়ে এস্তাফা ফেব্রুয়ারিতে মারা যায়।
“আমার মেয়েটা পেটের ব্যথায় কষ্ট পেতে পেতে মারা গেল,” বলেন কাতর কণ্ঠে মরিয়ম। চিকিৎসকরা জানান, মৃত্যুর কারণ ছিল অ্যাসপিরেশন নিউমোনিয়া এনসেফালাইটিস, যদিও তারা বাজেট সংকটকে দায়ী করেননি।

তবুও মরিয়মের মতো অসংখ্য মায়ের চোখে এখন এক প্রশ্ন—

“আমরা আগে আমেরিকার সহায়তা পেতাম। আবারও তারা আমাদের সাহায্য করুক।”

আইআরসি বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর হাসিনা রহমান বলেন,

“এটি একটি মানবিক বিপর্যয় তৈরি করছে। হাসপাতালে লম্বা লাইন, সেবায় সীমাবদ্ধতা—সবকিছু ধসে পড়ছে।”

News Source: cnn.com

Related Articles

Stay Connected

5,000FansLike
4,000FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

Latest Articles