বিশ্বজুড়ে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সংক্রমণ বা এএমআর এখন জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় হুমকি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাব বলছে, প্রতি ছয়টি সংক্রমণের একটি ঘটে ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণুর কারণে। নবজাতক মৃত্যুর ক্ষেত্রেও এএমআর দায়ী প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এর মধ্যে প্রতি বছর সেপসিসে আক্রান্ত হয় ৫০ লাখেরও বেশি শিশু, মারা যায় প্রায় ৮ লাখ।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে চিকিৎসা গবেষণায় নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে শতবর্ষী বিসিজি টিকা—যা দীর্ঘদিন ধরে কেবল যক্ষ্মা প্রতিরোধের টিকা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। নতুন প্রমাণ বলছে, জন্মের প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই বিসিজি দিলে প্রাণঘাতী সংক্রমণজনিত নবজাতক মৃত্যুহার প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে—এমনকি অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সুপারবাগের বিরুদ্ধেও সুরক্ষা দেয়।
গবেষণায় চমকপ্রদ ফল
সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের ৫ হাজারের বেশি অত্যন্ত দুর্বল ও কম ওজনের নবজাতকের ওপর হওয়া সবচেয়ে বড় র্যান্ডমাইজড ট্রায়ালে দেখা যায়—
- জন্মের সময় বিসিজি দেওয়া হলে এক মাসের মধ্যে সার্বিক মৃত্যুহার ১৭% কমে
- সংক্রমণজনিত মৃত্যু প্রায় ৫০% পর্যন্ত কমে
- মাত্র ৭টি শিশুকে জন্মের সময় বিসিজি দিলেই একটি জীবন রক্ষা সম্ভব
এমন প্রমাণ ইঙ্গিত করে, বিসিজি নবজাতকের জন্মগত রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ‘প্রশিক্ষিত’ করে তোলে, যাতে সংক্রমণের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রতিক্রিয়া সম্ভব হয়।
দেরি হচ্ছে বড় বাধা
বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর প্রায় ১০ কোটি শিশুকে বিসিজি দেওয়ার কথা থাকলেও বেশিরভাগ শিশু জন্মের কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস পরে গিয়ে টিকা পায়। অপরিণত বা কম ওজনের শিশুদের ক্ষেত্রে জন্মের সময় টিকা না দেওয়ার প্রবণতা আরও বেশি—যদিও তারাই সবচেয়ে ঝুঁকিতে।
ডব্লিউএইচও ২০১৬ সালের রিভিউতে বিসিজির নন-স্পেসিফিক উপকারিতা স্বীকার করলেও এখনো তা বৈশ্বিক টিকানীতিতে প্রতিফলিত হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, নীতিনির্ধারকদের দ্বিধা, ভুল ধারণা, বাজেট অগ্রাধিকার এবং ওষুধশিল্পের স্বার্থ—এসবই এই ধীরগতির কারণ।
যুদ্ধক্ষেত্রে বিসিজি হতে পারে জীবনরক্ষাকারী
গাজা, ইউক্রেনসহ যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে হাসপাতাল ও পানি–বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সংক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ছে। ক্লোরিন, অ্যান্টিবায়োটিক, জীবাণুনাশক যন্ত্রপাতি না থাকায় সুপারবাগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে বিসিজি টিকা হতে পারে সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা—
- সস্তা (প্রতি ডোজ ১০ সেন্ট)
- প্রয়োগ সহজ
- কোল্ড চেইন ব্যয় কম
- জন্মেই দেওয়া যায়
- অপরিণত শিশুদের ওপরও নিরাপদ
কারণ–প্রমাণ–সমাধান: সবই প্রস্তুত, শুধু প্রয়োগ বাকি
বিজ্ঞানীরা বলছেন—নবজাতক সংক্রমণ ও অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণুর বিরুদ্ধে বিসিজি টিকা এক বিরল ‘উইন–উইন’ সুযোগ:
- বছরে বাঁচাতে পারে প্রায় ৫ লাখ নবজাতকের জীবন
- কমাতে পারে এএমআর–এর বৈশ্বিক হুমকি
- খরচ পড়বে প্রতি শিশুর জন্য মাত্র ২ ডলারেরও কম
অ্যান্টিবায়োটিক ব্যর্থ হওয়ার আগেই বিসিজি টিকা হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে সাশ্রয়ী জীবনরক্ষাকারী সমাধান। বৈজ্ঞানিক প্রমাণ দশকের পর দশক উপেক্ষিত থাকলেও, এখনই সময় এই পুরোনো টিকাকে নতুনভাবে কাজে লাগিয়ে এএমআরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাস্তব পরিবর্তন আনার।



