26.8 C
Dhaka
Wednesday, June 10, 2026

গাজায় সেনা পাঠাতে পাকিস্তানের ওপর ট্রাম্পের চাপ, কঠিন পরীক্ষায় ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির

কয়েক দশকের মধ্যে পাকিস্তানের সবচেয়ে ক্ষমতাধর সামরিক প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির নতুন ক্ষমতা পাওয়ার পর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্র গাজায় প্রস্তাবিত ‘স্থিতিশীলতা বাহিনী’তে পাকিস্তানি সেনা পাঠানোর জন্য ইসলামাবাদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে, যা দেশটির অভ্যন্তরে তীব্র প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

রয়টার্সের দুইটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের জন্য ওয়াশিংটন সফর করতে পারেন আসিম মুনির। গত ছয় মাসে এটি হবে ট্রাম্প ও মুনিরের তৃতীয় বৈঠক। বৈঠকের প্রধান আলোচ্য বিষয় হতে পারে গাজায় প্রস্তাবিত বহুজাতিক বাহিনীতে পাকিস্তানের ভূমিকা। সূত্রগুলোর একজন পাকিস্তানের অর্থনৈতিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা একজন জেনারেল।

ট্রাম্প প্রশাসনের ২০ দফা গাজা পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, দীর্ঘ দুই বছরের বেশি সময় ধরে ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে বিধ্বস্ত গাজার পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য একটি রূপান্তরকালীন সময় প্রয়োজন। এই সময়ের নিরাপত্তা ও শাসন তত্ত্বাবধানে মুসলিম দেশগুলোকে নিয়ে একটি যৌথ ‘স্থিতিশীলতা বাহিনী’ গঠনের আহ্বান জানানো হয়েছে।

তবে এই পরিকল্পনা নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বহু দেশ। তাদের আশঙ্কা, গাজার ইসলামপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসকে সামরিকভাবে মোকাবিলা করতে গেলে বাহিনী সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। এতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ফিলিস্তিনপন্থী ও ইসরায়েলবিরোধী জনগণের ক্ষোভও উসকে উঠতে পারে।

এদিকে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে কাজ করছেন ফিল্ড মার্শাল মুনির। জুন মাসে তাকে হোয়াইট হাউসে মধ্যাহ্নভোজে আমন্ত্রণ জানান ট্রাম্প। এটি ছিল নজিরবিহীন—কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই প্রথম বেসামরিক নেতৃত্ব ছাড়াই পাকিস্তানের সেনাপ্রধানকে এককভাবে আতিথ্য দেন।

ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ‘গাজা স্থিতিশীলতা বাহিনীতে অবদান না রাখলে ট্রাম্প অসন্তুষ্ট হতে পারেন। এটি পাকিস্তানের জন্য বড় বিষয়, কারণ দেশটি মার্কিন বিনিয়োগ ও নিরাপত্তা সহায়তা নিশ্চিত করতে ট্রাম্পের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল।’

বিশ্বের একমাত্র মুসলিম পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ পাকিস্তানের সেনাবাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে দক্ষ হলেও, এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, ‘পাকিস্তানের সামরিক শক্তি যত বাড়ছে, ফিল্ড মার্শাল মুনিরের ওপর তত বেশি ক্ষমতা প্রদর্শন ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।’

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী, পররাষ্ট্র দপ্তর ও তথ্য মন্ত্রণালয় রয়টার্সের প্রশ্নে কোনো মন্তব্য করেনি। হোয়াইট হাউসও এ বিষয়ে নীরব রয়েছে।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার গত মাসে বলেন, শান্তিরক্ষার জন্য সেনা পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে, তবে হামাসকে নিরস্ত্র করা পাকিস্তানের দায়িত্ব নয়। এদিকে চলতি মাসের শুরুতে মুনিরকে বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর প্রধান হিসেবেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে ২০৩০ সাল পর্যন্ত। তিনি আজীবন ফিল্ড মার্শাল পদে থাকবেন এবং যেকোনো ফৌজদারি মামলায় আজীবন দায়মুক্তি পাবেন।

কুগেলম্যান বলেন, ‘পাকিস্তানে খুব কম মানুষই আসিম মুনিরের মতো ঝুঁকি নিতে পারেন। তার ক্ষমতা এখন সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত।’

তবে ঝুঁকিও কম নয়। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, তুরস্ক, জর্ডান, মিসর ও কাতারের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন মুনির। সেনাবাহিনী জানিয়েছে, গাজা বাহিনী নিয়ে তিনি পরামর্শ করছেন।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, গাজায় পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন হলে দেশটির ইসলামপন্থী দলগুলো ব্যাপক বিক্ষোভে নামতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী এসব দল লাখো মানুষ রাস্তায় নামানোর সক্ষমতা রাখে। এমনকি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দলও সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সিঙ্গাপুরের এস. রাজরত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো আব্দুল বাসিত বলেন, ‘গাজায় পরিস্থিতি খারাপ হলে তা দ্রুত পাকিস্তানের জন্য বড় সংকট হয়ে উঠবে। তখন মানুষ বলবে—আসিম মুনির ইসরায়েলের নির্দেশ বাস্তবায়ন করছেন। এটি মোটেও অপ্রত্যাশিত হবে না।’

সূত্র: রয়টার্স

Related Articles

Stay Connected

5,000FansLike
4,000FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

Latest Articles