পৌষের প্রথম ভোরে হিমেল বাতাস আর শিশিরভেজা সবুজ ঘাসে লাল আভা ছড়িয়ে দেওয়া রক্তিম সূর্য যেন মনে করিয়ে দিল দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ আর এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বিজয়ের কথা। ১৬ ডিসেম্বর—মহান বিজয় দিবস। যথাযোগ্য মর্যাদা ও ব্যাপক উৎসাহ–উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে বিজয়ের ৫৪ বছর পূর্তি উদযাপন করেছে জাতি।
ভোর থেকেই সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে। হাতে ফুল, ব্যানার ও জাতীয় পতাকা নিয়ে বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে উপস্থিত হন নানা বয়স ও শ্রেণি-পেশার মানুষ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তাঁরা একটি নতুন গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
বিজয় দিবসের সূচনা হয় রাজধানীতে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে। সকাল ৬টা ৩৩ মিনিটে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং ৬টা ৫৬ মিনিটে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এ সময় সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার প্রদান করে। বিউগলের করুণ সুরে স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে আবেগঘন।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কুশলবিনিময় করেন। উপস্থিত ছিলেন প্রধান বিচারপতি, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা, তিন বাহিনীর প্রধান, কূটনীতিক ও ঊর্ধ্বতন সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তারা।
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে জাতীয় স্মৃতিসৌধ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। শিক্ষার্থী, মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক নেতা-কর্মীসহ হাজারো মানুষ পর্যায়ক্রমে শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। শিশুদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো—অনেকে মুখে ও হাতে জাতীয় পতাকার ছবি এঁকেছে, কেউ কেউ কণ্ঠ মিলিয়েছে দেশাত্মবোধক গানে।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ৫৪ বছর পরও গণ-অভ্যুত্থানের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করে রাষ্ট্র এখনো একাত্তরের স্বপ্ন পূরণে ব্যর্থ। তিনি বলেন, আগামী নির্বাচন গণতন্ত্র ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনে ভিত্তি স্থাপন করবে—এটাই প্রত্যাশা।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানান। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, একাত্তর ও ২০২৪ এক নয়—দুটি সময় তাদের নিজস্ব ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থতার কারণেই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে।
ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, স্বাধীন ভূখণ্ডে ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা এখনো পূরণ হয়নি।
বিজয় দিবস উপলক্ষে দেশজুড়ে সরকারি-বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, আলোকসজ্জা, বিজয় মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কবিতা আবৃত্তি ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়। বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোতেও দিবসটি পালিত হয় যথাযথ মর্যাদায়।
গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লেখানোর লক্ষ্যে ৫৪ জন প্যারাট্রুপার জাতীয় পতাকা হাতে আকাশ থেকে ঝাঁপ দেন, যা বিজয়ের ৫৪ বছর পূর্তিকে করে তোলে আরও স্মরণীয়।
দিনের শেষে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট গান, নাচ ও কবিতা আবৃত্তির মধ্য দিয়ে আয়োজন করে ‘বিজয় উৎসব ২০২৫’। বিজয়ের এই দিনে শ্রদ্ধা, উৎসব আর আত্মসমালোচনার মধ্য দিয়ে দেশবাসী নতুন করে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে—একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার।



