26.8 C
Dhaka
Wednesday, June 10, 2026

১৫ মাসে কি বদলাল ‘নতুন বন্দোবস্ত’? বিদায়ী দুই ছাত্র–উপদেষ্টার কাজ নিয়ে উঠছে তীব্র প্রশ্ন

অন্তর্বর্তী সরকারের দুই উপদেষ্টা—মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া—১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার ঠিক আগের দিন পদত্যাগ করেছেন। বুধবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাঁরা পদত্যাগপত্র জমা দেন।

জুলাইয়ের গণ–অভ্যুত্থানে ছাত্রদের নেতৃত্ব থেকে উঠে আসা এই দুই তরুণকে ঘিরে জনগণের প্রত্যাশা ছিল বিপুল—বিশেষ করে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি কমানো এবং ‘নতুন বন্দোবস্ত’ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে। তবে ১৫ ও ১৩ মাস সরকারের দায়িত্ব পালনের পর তাঁদের কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে উল্টো প্রশ্নই বাড়ছে।

টিআইবির পর্যবেক্ষণ: প্রত্যাশা পূরণ হয়নি

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে তাঁদের কাছে মানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক।
“কিন্তু সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভূমিকা তাঁরা রাখতে পারেননি। বরং তাঁদের মন্ত্রণালয়ে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠে এসেছে।”

গত সেপ্টেম্বরেই দুই উপদেষ্টাকে পদত্যাগ করার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু তাঁরা পদত্যাগ না করে ক্ষমতার প্রতি আকর্ষণে ‘আটকে’ ছিলেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।


আসিফ মাহমুদ: ১৫ মাসে অর্জনের চেয়ে বিতর্ক বেশি

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে অন্যতম নেতৃত্ব ও ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির ঘোষক হিসেবে পরিচিত আসিফ মাহমুদ অন্তর্বর্তী সরকারের গঠনের দিন থেকেই শ্রম ও যুব–ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। পরে তিনি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেও যুক্ত হন—যা বাংলাদেশের সবচেয়ে বাজেট–সমৃদ্ধ মন্ত্রণালয়গুলোর একটি।

তিনি দাবি করেছেন, বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক নির্মাণ, পানি সরবরাহ, সাশ্রয়ী প্রকল্প বাস্তবায়নসহ ২৩টি বড় প্রকল্প অনুমোদন করিয়েছেন।

কিন্তু তাঁর বক্তব্যে দুর্নীতি দমন, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, অপচয় কমানো বা প্রকল্পের মান বাড়াতে কী করেছেন—এসবের কোনো উল্লেখ নেই।

বিতর্কিত প্রকল্প ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ

  • কুমিল্লার মুরাদনগর, তাঁর নিজ উপজেলায় ৪৫৩ কোটি টাকার উন্নয়ন বরাদ্দ—সবচেয়ে বেশি বরাদ্দপ্রাপ্ত এলাকা।
  • ঢাকার মাত্র তিনটি আসনে বিশেষ উন্নয়ন বরাদ্দের ২৭৩টির মধ্যে ১৪৫টি ছিল ঢাকা–১০ এ, যেখান থেকে তিনি নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন।
  • জেলা পরিষদের মাধ্যমে ৪৪ উপজেলায় পাঠাগার প্রকল্প—যা মূলত গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের কাজ, কিন্তু তাদের জানানো হয়নি।
  • যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে আইসিটির মতো ৩৪৬ কোটি টাকার ফ্রিল্যান্সিং প্রকল্প—যার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন।

এপিএসের দুর্নীতি ও অস্ত্রবিতর্ক

  • তাঁর এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেন দুর্নীতির অভিযোগে আলোচনায় আসেন—পরে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়।
  • বিমানবন্দরে আসিফ মাহমুদের ব্যাগে ম্যাগাজিন–গুলি পাওয়া গেলে তা নিয়েও বিতর্ক ছড়ায়।

মাহফুজ আলম: ১৩ মাসে চোখে পড়ার মতো অর্জন নেই

মাহফুজ আলম প্রথমে ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী, পরে তথ্য উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন। তাঁকে বিশ্বমঞ্চে ‘গণ–অভ্যুত্থানের মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে প্রচার করেছিলেন প্রধান উপদেষ্টা।

কিন্তু বাস্তবে তথ্য মন্ত্রণালয়ে তিনি কাঙ্ক্ষিত সংস্কার আনতে পারেননি।

লাইসেন্স নিয়ে বিতর্ক

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের মতো একই প্রক্রিয়ায় তাঁর সময়ে দুটি নতুন স্যাটেলাইট টিভির লাইসেন্স দেওয়া হয়—যেগুলোর মালিকানা তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মীদের বলে অভিযোগ উঠেছে।

অফিসে অনুপস্থিতি ও নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ

  • নিয়মিত অফিসে না আসা
  • সাংবাদিক সুরক্ষা আইন অগ্রাহ্য
  • গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে ব্যর্থতা
  • সরকারি বিজ্ঞাপন বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করা

স্বজনপ্রীতির অভিযোগ

তাঁর বড় ভাইকে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির পর্ষদে নিয়োগ দেওয়া হয়—যা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।


রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: ‘নতুন বন্দোবস্ত’ আসেনি

গবেষক আলতাফ পারভেজ বলেন,
“গণ–অভ্যুত্থানের নেতাদের সরকারে নেওয়া হয়েছিল সংস্কারের আশায়। কিন্তু তাঁরা তাঁদের দায়িত্বে থেকে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়েছেন।”


ছাত্রদের আন্দোলনের নেতৃত্বে উঠে আসা দুই তরুণ উপদেষ্টার প্রতি মানুষের প্রত্যাশা ছিল ব্যতিক্রমী শাসনধারা ও স্বচ্ছ প্রশাসন। কিন্তু ১৩–১৫ মাস পর তাঁদের পদত্যাগের মুহূর্তে যে চিত্র সামনে এসেছে, তা প্রশ্নেই ভরা—

দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকার কোথায় গেল?
‘নতুন বন্দোবস্ত’ বাস্তবায়নের জন্য তাঁদের ভূমিকা কোথায়?

জনগণের প্রত্যাশা পূরণে তাঁরা ব্যর্থ—এমনই অভিমত বিশেষজ্ঞদের।

Related Articles

Stay Connected

5,000FansLike
4,000FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

Latest Articles