বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে আহসান এইচ মনসুর–এর নিয়োগ বাতিল করে নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ব্যবসায়ী মো. মোস্তাকুর রহমান–কে। বুধবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের জারি করা প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়। নতুন নিয়োগ অনুযায়ী, অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে কর্ম–সম্পর্ক পরিত্যাগের শর্তে যোগদানের তারিখ থেকে চার বছরের জন্য তাঁকে গভর্নর পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আদেশটি জনস্বার্থে অবিলম্বে কার্যকর করা হয়েছে।
এর আগে পৃথক প্রজ্ঞাপনে আহসান এইচ মনসুরের চুক্তির অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করা হয়। ২০২৮ সালের ১৩ আগস্ট পর্যন্ত তাঁর মেয়াদ ছিল। গত কয়েক দিন ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের একদল কর্মকর্তা তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলন করছিলেন। চুক্তি বাতিলের আগে এক সংবাদ সম্মেলনে আহসান মনসুর বলেন, “পদত্যাগ করতে আমার মাত্র দুই সেকেন্ড সময় লাগবে।” সংবাদ সম্মেলনের কিছুক্ষণের মধ্যেই নতুন গভর্নর নিয়োগের খবর প্রকাশ পায়।
প্রথমবার ব্যবসায়ী গভর্নর
মোস্তাকুর রহমান হবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৪তম গভর্নর। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো ব্যবসায়ীকে গভর্নর পদে নিয়োগ দেওয়া হলো। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং দ্য ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি) থেকে এফসিএমএ ডিগ্রি লাভ করেন।
পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে, তিনি নারায়ণগঞ্জভিত্তিক পরিবেশবান্ধব প্রতিষ্ঠান হেরা সোয়েটার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। আবাসন খাতেও তাঁর ব্যবসা রয়েছে। করপোরেট ফিন্যান্স, রপ্তানি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় তিন দশকের বেশি অভিজ্ঞতার কথা তাঁর জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ রয়েছে। তিনি বিজিএমইএ, রিহ্যাব, আটাব ও ঢাকা চেম্বারের সদস্য এবং বিভিন্ন কমিটিতে কাজ করেছেন। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেডেও তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল।
তবে ব্যাংক খাতের একটি সূত্র জানিয়েছে, একটি বেসরকারি ব্যাংকে তাঁর প্রতিষ্ঠানের ঋণ খেলাপি হয়ে পুনঃতফসিলের আওতায় এসেছে—যা নতুন দায়িত্বে সম্ভাব্য স্বার্থসংঘাতের প্রশ্ন তুলেছে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও চ্যালেঞ্জ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের পর ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন আনছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, নতুন সরকারের নীতি ও অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের প্রয়োজনেই এসব পরিবর্তন।
আহসান মনসুর দায়িত্ব নেওয়ার পর ডলারের বাজারভিত্তিক দর নির্ধারণ, রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রকাশসহ বেশ কিছু সংস্কার উদ্যোগ নেন। বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি এবং একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা বিদ্যমান। বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা, খেলাপি ঋণ আদায়, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং চলমান সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া—এসবই হবে নতুন গভর্নরের সামনে বড় পরীক্ষা।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, নতুন গভর্নরের জন্য এটি হবে ‘অ্যাসিড টেস্ট’। ব্যবসায়ী পরিচয়ের কারণে স্বার্থসংঘাতের সম্ভাবনা থাকলেও তাঁকে নির্মোহভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সব মিলিয়ে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আস্থা পুনরুদ্ধার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতা বাড়ানো—এসব লক্ষ্য অর্জনে মোস্তাকুর রহমান কতটা সফল হন, সেদিকেই এখন নজর অর্থনৈতিক মহলের।



