নবগঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এখন চরম রাজনৈতিক সংকটে। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনি ঐক্যের সিদ্ধান্তের পর থেকেই দলটিতে শুরু হয়েছে ব্যাপক ভাঙন। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে শুরু করে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের পরিচিত মুখ—একজনের পর একজন পদত্যাগ করছেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এনসিপির কেন্দ্রীয় ও মাঠপর্যায়ের অধিকাংশ পরিচিত নেতা এখন দল ছাড়ার তালিকায় যুক্ত হয়েছেন অথবা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের সঙ্গে জোটের সিদ্ধান্ত এনসিপির জন্য আদর্শিকভাবে ‘আত্মঘাতী’ হয়ে উঠেছে। যে দলটি জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও ছাত্র–জনতার রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন রাজনীতির স্বপ্ন দেখিয়েছিল, সেই দলটি পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সঙ্গে আপস করায় আস্থা হারাচ্ছে নিজস্ব নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যেই।
এনসিপির ভেতরে সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের হলফনামায় দেখানো আয় নিয়েও। এই বিষয়টি নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে, যা দলের ভাবমূর্তিকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
সর্বশেষ বৃহস্পতিবার রাতে দলটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, মুখপাত্র, যুগ্ম সদস্য সচিব ও মিডিয়া সেলের প্রধান মুশফিক উস সালেহীন এনসিপির সব পদ-পদবি থেকে পদত্যাগ করেন। একই দিনে পদত্যাগ করেন কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক খান মুহাম্মদ মুরসালীন। এর আগে ১ জানুয়ারি রাতে পদত্যাগের ঘোষণা দেন যুগ্ম আহ্বায়ক ও পলিসি অ্যান্ড রিসার্চ উইংয়ের প্রধান খালেদ সাইফুল্লাহ।
খালেদ সাইফুল্লাহর স্ত্রী ও এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারাও গত ২৮ ডিসেম্বর দল ছাড়েন। ঢাকা–৯ আসনে এনসিপির প্রার্থী থাকলেও তিনি পরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেন।
এনসিপি থেকে সদ্য পদত্যাগ করা মুশফিক উস সালেহীন বলেন, জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনি আসন সমঝোতার সিদ্ধান্তের পর থেকেই দলের ভেতরে মতবিরোধ চরমে পৌঁছেছে। তাঁর ভাষায়, এনসিপি যে নতুন ধারার রাজনীতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেই জায়গা থেকে সরে এসে পুরোনো বন্দোবস্তের রাজনীতিতেই ঢুকে পড়েছে দলটি। এতে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত গড়ার সম্ভাবনা নষ্ট হয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ফারহান ফাইয়াজের বাবা শহিদুল ইসলাম বলেন, শহীদ পরিবার ও আহতদের প্রত্যাশা ছিল এনসিপির ওপর। কিন্তু যেভাবে পরিচিত মুখগুলো দল ছাড়ছেন, তাতে তারা গভীরভাবে হতাশ হচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক শহীদ পরিবারের সদস্য বলেন, এনসিপির এই ভাঙন জুলাইয়ের পক্ষের রাজনীতিকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সরকার যেমন প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ, তেমনি এনসিপির কাছ থেকেও তারা প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাচ্ছেন না।
এনসিপির একাধিক নেতার অভিযোগ, জামায়াতের সঙ্গে জোটের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দলটির ‘বিশেষ’ দুই শীর্ষ নেতার মতই চূড়ান্ত ছিল। কেন্দ্রীয় অধিকাংশ নেতার মতামত উপেক্ষা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে অনেকেই আদর্শিক দায়বদ্ধতা থেকে পদত্যাগ করছেন।
এখন পর্যন্ত এনসিপি থেকে অন্তত ১৪ জন কেন্দ্রীয় নেতা পদত্যাগ করেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ডা. তাসনিম জারা, তাজনূভা জাবীন, আজাদ খান ভাসানী, খালেদ সাইফুল্লাহ, মুশফিক উস সালেহীনসহ আরও অনেকে। অনেকে আবার পদত্যাগ না করলেও দলীয় কার্যক্রম থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, এনসিপিতে এই ভাঙন নিঃসন্দেহে বড় ধরনের ক্ষতি। জামায়াতের সঙ্গে জোটকে কেবল নির্বাচনি সমঝোতা হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও, পদত্যাগকারীরা সেই ব্যাখ্যায় আস্থা রাখতে পারছেন না। বিশেষ করে নারী নেতৃত্বের একটি বড় অংশ সরে যাওয়ায় দলটি আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
সব মিলিয়ে, নতুন ধারার রাজনীতির প্রতিশ্রুতি নিয়ে যাত্রা শুরু করা এনসিপি এখন নেতৃত্ব সংকট, আদর্শিক দ্বন্দ্ব ও আস্থার অভাবে বড় ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।



